একজন স্বেচ্ছাসেবকের জন্য করণীয় কিছু বিষয়

যারা জরুরী সময়ে মুমুর্ষ রোগির জন্য রক্তদাতা ম্যানেজ করে থাকেন, তাদেরকে সাধারণত আমরা আমাদের ভাষায় রক্তযোদ্ধা, রক্ত সৈনিক অথবা স্বেচ্ছাসেবক বলে থাকি।

তবে এ ধরণের স্বেচ্ছাসেবক হতে হলে যে অন্য সব মানুষদের চেয়ে কিছুটা এক্সট্রা অর্ডিনারি পরিস্রমের কাজ করতে হয়, তা অনেকেই মাথায় রাখেন না। তাছাড়া ব্লাড ম্যানেজমেন্ট এর কাজ করার সময় কিছু নিয়মও অবশ্যই মেনে চলতে হয়। যাতে কিছু সমস্যা এড়ানো যায় এবং ব্লাড ম্যানেজ করা সহজ হয়।

এই রকম কিছু নিয়ম আমি মনে করি সকল রক্তযোদ্ধাদের অবশ্যই মেনে চলা উচিৎ।

যেমন :
১. সর্বপ্রথমে নিজে একজন স্বেচ্ছায় রক্তদাতা হতে হবে। এবং তিন থেকে চার মাস পর পর নিয়মিত রক্তদান করতে হবে। যদি শারীরিকভাবে কোন কারণে রক্তদান করতে অপারগ হন, সেক্ষেত্রে রক্তদান না করলেও চলবে।

২. একজন স্বেচ্ছাসেবকের কাছে বেশ কিছু সংখ্যক স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের ডাটা বা তথ্য সংগ্রহে থাকা উচিৎ। সেখানে ডোনারের নাম, ঠিকানা, ব্লাড গ্রুপ, লাস্ট রক্তদানের তারিখ এবং ফোন নাম্বার অবশ্যই থাকতে হবে।

৩. রক্তের প্রয়োজনে কেউ ফোন করলে প্রথমে রোগির সম্পর্কে বিস্তারিত জেনে নিতে হবে, তারপর রক্তদাতা খুজতে হবে। সেক্ষেত্রে রোগির সমস্যা, ব্লাড গ্রুপ, রোগির বয়স, কত ব্যাগ ব্লাড দরকার, কত তারিখ এবং কোন সময়ের মধ্যে লাগবে, রোগির সাথে যিনি আছেন সেই আত্মীয়ের ফোন নাম্বার এবং রোগির সাথে তার সম্পর্ক, যে হাসপাতালে রক্ত নেয়ে হবে তার নাম ও ঠিকানা, হাসপাতালে ভর্তি থাকলে ওয়ার্ড/কেবিন নং এবং বেড নং ইত্যাদি তথ্য অবশ্যই জেনে নিতে হবে।

৪. রোগির কোন আত্মীয় রক্তের প্রয়োজনে ফোন করলে তার রক্তের গ্রুপ জেনে নেওয়া যেতে পারে, যাতে ভবিষ্যতে তার গ্রুপের রক্তের প্রয়োজন হলে যেন উনাকে রক্তদান করানো যায়।

৫. ফেইসবুকে পোস্ট করার সময় সুন্দর করে গুছিয়ে সকল তথ্যসহ পোস্ট দিতে হবে।
এ ক্ষেত্রে রোগির সমস্যা, ব্লাড গ্রুপ, কয় ব্যাগ দরকার, কোন সময়ের মধ্যে, হাসপাতালের নাম, ভর্তি থাকলে হাসপাতালের ওয়ার্ড/কেবিন এবং বেড নং, আর ভর্তি না থাকলে লিখে দিতে হবে যে, “রক্তদাতা পেলে ভর্তি হবেন”, যোগাযোগের জন্য ফোন নাম্বার এবং ব্র্যাকেটে রোগির সাথে সম্পর্ক লিখতে হবে।

৬. ব্লাড পাওয়া গেছে কিনা তা নিয়মিত খোজ নিয়ে দেখতে হবে। প্রয়োজনে রোগির আত্মীয়কে ফোন করে জিজ্ঞাসা করা লাগতে পারে।

৭. রক্তদাতা পাওয়া গেলে সম্ভব হলে পোস্ট আপডেট করে দিতে হবে যে ব্লাড পাওয়া গেছে, এতে সবাই নিশ্চিত হতে পারবে।

৮. শুধুমাত্র ফেইসবুকে রক্তদাতা খুজলেই চলবে না, ডোনার লিস্ট থেকেও খোজার চেষ্টা করতে হবে।
নিজে যদি ডোনার লিস্ট এর সবাইকে ফোন করতে না পারেন, তবে সেই লিস্টটা সম্ভব হলে রোগির আত্মীয়কে এসএমএস, ইমেইল, ফেইসবুক অথবা যে কোন মাধ্যমে দিয়ে দিতে পারেন। যাতে তারা নিজ প্রচেষ্টায় সেই লিস্ট থেকে রক্তদাতা খুজে নিতে পারেন।

৯. কেউ জরুরী প্রয়োজনে আপনাকে ফোন করেছে, কিন্তু ওই সময়ে আপনি কোন একটা জরুরী কাজে ব্যাস্ত আছেন, তখন আপনার উচিৎ আপনার পরিচিত কোন এক স্বেচ্ছাসেবক এর সাথে ওই লোকটাকে যোগাযোগ করিয়ে দেয়া, যাতে আপনি না পারলেও অন্য স্বেচ্ছাসেবক সেই রোগিকে রক্তদাতা পেতে সাহায্য করতে পারে।

১০. রোগির আত্মীয়রা যেন কোন ডোনারের সাথে কোন প্রকার আর্থিক লেনদেন না করেন, সে ব্যাপারে মানা করে দেয়া। এবং ফেইসবুকের থেকে নাম্বার নিয়ে কোন ফ্রড বিকাশে টাকা পাঠাতে বললে যেন না পাঠায়, এবং স্বেচ্ছাসেবকদের এই ব্যাপারে জানানোর জন্য বলতে হবে।

১১. অনেক ক্ষেত্রে রোগির জন্য ব্লাড ম্যানেজ হওয়ার পরও অনেকে সেই আত্মীয়কে ব্লাড দেয়ার জন্য ফোন করে থাকেন, সে ক্ষেত্রে রোগির আত্মীয়কে বলে রাখা যে, কেউ যদি ব্লাড দেয়ার জন্য ফোন করে তবে তার নাম, ঠিকানা এবং ফোন নাম্বার যেন সংগ্রহে রাখেন।
যখন ওই রোগির ব্লাড ম্যানেজ হয়ে যায় তারপর সেই বাড়তি ডোনারের ফোন নাম্বার রোগির আত্মীয়ের কাছ থেকে কালেক্ট করে রাখতে পারেন, যাতে অন্য কোন রোগির সেই গ্রুপের ব্লাড দরকার হলে যেন সহজে ডোনার পাওয়া যায় এবং ওই ডোনারদের দিয়ে হেল্প করানো যায়।

আশা করি উপরে উল্লেখিত কাজগুলো করলে একজন স্বেচ্ছাসেবক ঝামেলামুক্তভাবে এ কাজে এগিয়ে যেতে পারে। এসব মেনে চললে অনেক সহজে ডোনার ম্যানেজ করা যায়।
(বি:দ্র: আপনাদের কারো এসব ছাড়া অন্য কোন আইডিয়া থাকলে শেয়ার করতে পারেন)

আমার গত কয়েক বছরের ব্লাড নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি এসব কতটা দরকারি। শুরুতে আমি এলোমেলো ভাবে কাজ করতেম, পরে নিয়মের মধ্যে কাজ করার চেষ্টা করতে থাকি। আমার দেখা দেখি আমার পরিচিত এবং অপরিচিত অনেকেই স্বেচ্ছায় রক্তদান করছে এবং ব্লাড ম্যানেজমেন্ট নিয়েও কাজ শুরু করেছে। এজন্য তাদের আন্তরিকভাবে স্রদ্ধা ও অভিনন্দন জানাই।
আলহামদুলিল্লাহ এই পর্যন্ত বেশ কিছু মানুষকে রক্তদাতা ম্যানেজ করতে সহযোগিতা করেছি, এখনো করি আর সামর্থ্য অনুযায়ী যতদিন পারি করবো।

রক্তস্নাত বাংলার মাটিতে একটি মানুষকেও রক্তের অভাবে মৃত্যুবরণ করতে দেবো না এই আমাদের অঙ্গিকার..!!

রক্তদান পেশা নয়, নেশা..!!
যে নেশায় জীবন বাঁচে।

রক্ত দিন, জীবন বাঁচান।

ধন্যবাদান্তে :

ইমন চৌধুরী
প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি
অর্পণ ব্লাড ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ।

একজন স্বেচ্ছাসেবকের জন্য করণীয় কিছু বিষয়

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *