অনলাইন মিডিয়া ও স্বেচ্ছাসেবী কাজের কিছু স্মৃতিময় সুখ দুঃখের অভিজ্ঞতা

ইমন চৌধুরী :

২০১১ সালের এপ্রিল মাসে একটি কোম্পানীতে আইটি সার্ভিসে পার্ট টাইম কাজ নেই। তখন কম্পিউটার অপারেটিং এ ব্যাসিক ধারণা ও ভাল টাইপিং স্কিল থাকলেও আইটি তে তেমন দক্ষতা ছিল না বললেই চলে। অফিসটা আমার চাচার ছিল বলে কম্পিউটার চালনায় দক্ষতার জন্য আমাকে সেই দায়িত্ব দিয়ে দিলো। এস এস সি পাশের পর লম্বা ছুটির সময়গুলো পার করেছিলাম সেই প্রতিষ্ঠানে কাজ করে। আস্তে আস্তে সেখানে থেকে বেশ কিছু প্রফেশনালিজম শিখলাম, আইটি সেক্টরেরও কিছু ব্যাসিক ধারণা হলো। সেই ২০১১ সালের এপ্রিল মাসেই প্রথম ফেইসবুক আইডি খুললাম। এরপর থেকেই শুরু হলো আমার অনলাইন জগতে নিজের মেধাকে কাজে লাগিয়ে সবার জন্য প্রয়োজনীয় কিছু করার স্বপ্ন।

২০১২ সালে আইএইচ টি তে ক্লাশ শুরু হবার পর আইটি অফিস থেকে চাকরিটা ছেড়ে দিয়ে আবার পড়ালেখায় মনোযোগী হলাম। সে সময় ফেইসবুকিং এক রকম নেশায় রূপ নিতে শুরু করলো। দিনের অধিকাংশ সময় ফেইসবুকেই কেটে যেতো।

একটা সময় চিন্তা করলাম, এই সোশ্যাল মিডিয়াকে আরো ভালভাবে মানুষের কল্যানে ব্যবহার করা যায় কিনা। তখন ভাবতে ভাবতে এক সময় অনুধাবন করলাম, আমাদের ক্যাম্পাসের বিষয়ে অনলাইনে (গুগল, ফেইসবুক) তেমন কোন নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায় না। নেই কোন ওয়েবসাইট, একটিভ ফেইসবুক পেইজ। তখন দেখলাম অন্যান্য কলেজ/ভার্সিটিগুলোর তো ঠিকই অনলাইনে সকল তথ্য পর্যাপ্ত আছে। তাদেরটা খুজলেই সহজে পাওয়া যায়। কিন্তু আমাদের তথ্যের জন্য কেন এখনো এদিক ঐদিক দৌড়াতে হয়?

এরপর সেই চিন্তা থেকেই ২০১৩ সালের অক্টোবর মাসের দিকে আমার প্রতিষ্ঠানের নামে (Instutute of Health Technology, Dhaka) একটা ফেইসবুক ফ্যানপেইজ খুললাম। সেখানে আস্তে আস্তে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছবি, তথ্য, নোটিশ, রুটিন, পেশাভিত্তিক তথ্য ইত্যাদি পোস্ট দিতে লাগলাম। অন্যদিকে আমার এক ছোট ভাই (মাহমুদ নোমান) দেখলাম মেডিকেল টেকনোলজিষ্টদের সংগঠিত করার লক্ষ্যে Bangladesh Medical Technology Students Associaton – BMTSA নামে আরেকটি ফেইসবুক পেইজ খুলেছে। এরপর আমিও সেই পেইজের এডমিন হলাম, সেও ক্যাম্পাসের পেইজের এডমিন হলো। দুজনে মিলে শুরু করলাম তথ্য আদান প্রদানের এক অদ্ভুদ নেশা। পড়ালেখার পাশাপাশি পেশাভিত্তিক বিভিন্ন লেখা, তথ্য, ছবি আমাদের পেইজগুলোতে প্রকাশ করতাম। আস্তে আস্তে পেইজগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। একটা সময় সেই Bangladesh Medical Technology Students Association – BMTSA নামে একটি পূর্ণাঙ্গ সংগঠন প্রতিষ্ঠা করা হয়। সংগঠনটি আমাদের পেইজের নামে হওয়ায় এবং আমাদেরকেই সেই সংগঠনের প্রচারণামূলক সকল কাজের দায়িত্ব দেয়ায় আমরা খুবই গর্বিতবোধ করি। এছাড়া বিভিন্ন পেশাজিবী ও শিক্ষার্থীরাও আমাদের এ সাফল্যে অভিনন্দন জানান।

মজার বিষয় ছিল তখনকার সময়ে বাজারে Android ফোন আসেনি। সবাই Java, Symbian ইত্যাদি ফোনসেট দিয়েই ইন্টারনেট চালাতো। সেগুলোতে বর্তমান Android Smartphone এর মতো এত সহজে বা এত ধরণের কাজ করা যেতো না। তখন আমি Nokia C3 এবং তার কিছুদিন পর Nokia 6120 Classic মডেল এর একটা সেট চালাতাম। আমার আর্থিক অবস্থা খুব একটা ভাল না থাকায় প্রয়োজন থাকলেও এর চেয়ে দামী ফোন কেনার সাধ্য ছিল না। কিন্তু তারপরও সেই ডিভাইসগুলো দিয়েই ছবি তোলা, বাংলায় নিউজ লেখা ইত্যাদি কাজ চালাতাম। সেটগুলোতে তখন বাংলা লেখার অপশন ছিল না। Bangla Text ডট কম নামে একটা ওয়েসবাইটে গিয়ে ফনেটিক থেকে কনভার্ট করে অনেক কষ্ট আর সময় ব্যয় করে বাংলা লিখতাম।

ক্যাম্পাস ভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক কাজের পাশাপাশি ২০১৩ সালের শেষের দিকে শুরু করলাম অনলাইন ব্লাড ম্যানেজমেন্ট এর কাজ। Donate Blood Save Life “রক্ত দিন, জীবন বাঁচান” নামে একটা ফেইসবুক ফ্যানপেইজ খুলে সেখানে জরুরী রক্তের প্রয়োজনে পোস্ট শেয়ার করে রক্তদাতা ম্যানেজ করার চেষ্টা করতাম। তখনও সেই টেক্সট কনভার্টার দিয়ে কষ্ট করে জরুরী রক্তের প্রয়োজনের পোস্ট সুন্দর করে লিখতাম। অর্থ সংকট ছিল, তাই মোবাইলে MB না থাকলে 0.facebook চালাতাম। তখন এতো সীমাবদ্ধতা থাকা সত্বেও ঠিকই কাজ চালিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু এখন এত সব ফ্যাসিলিটি থাকা সত্বেও কাজ করার সময় ও আগ্রহ আগের মতো নাই। মাঝেমাঝেই অলসতা করি। একটা সময় যেখানে আমি প্রতিদিন কম করে হলেও ৫০ পেইজ লেখা টাইপ করতাম। কিন্তু এখন আর আলসেমি করে করতে মন চায় না। আসলে যখন কোন কিছু সহজে পাওয়া যায়, তখন তার মর্ম কমে যায়। যখন ফ্যাসিলিটি কম ছিল তখন তা পাওয়ার প্রত্যাশায় হাহাকার করতাম।

রক্তদানের পাশাপাশি ২০১৪ সালের শুরু থেকে আরো জোড়ালোভাবে রক্তদাতা ম্যানেজ এর কাজ শুরু করি। তখন বিভিন্ন সিনিয়র স্বেচ্ছাসেবকদের ফলো করে তাদের কাজ করার বিভিন্ন স্টাইল, নিয়ম শৃঙ্খলা ইত্যাদি ফলো করতাম ও তা শিখে নিজের উপর এপ্লাই করে সেভাবে কাজ করার চেষ্টা করতাম। যতটা না সম্ভব নিজের কাজকে পারফেক্ট করার চেষ্টা করতাম। যার কাছে কোন টেকনিক ভাল লাগতো, তার কাছ থেকে তা রপ্ত করার চেষ্টা করতাম। এভাবে আস্তে আস্তে অনলাইন ব্লাড ম্যানেজমেন্ট এ প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করলাম আর সেটাকে কাজে লাগিয়ে নিয়মতান্ত্রিকভাবে কাজ করে যেতাম।

কিন্তু অত্যন্ত দু:খের বিষয়, এখনকার সময়ে হাজারো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবক থাকার ফলেও তখনকার মতো এত সুশৃঙ্খলভাবে কাজ করার চর্চা কমে আসছে। সবাই যার যার মতো অগোছালো কাজ করছে। অনেকেই কিছু জেনে/না জেনে ভুলভাবে কাজ করছেন ও সেগুলোই জুনিয়রদের শেখাচ্ছেন। যার ফলে স্বেচ্ছাসেবী পরিবারের মধ্যে আগের মতো নিয়ম শৃঙ্খলা ও কাজের সৌন্দর্য নেই। ফলে দিন যত বাড়ছে স্বেচ্ছাসেবীরা বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন। একে অপরের সাথে ভাতৃত্ব নষ্ট হওয়া সহ বিভিন্ন ধরণের বিবাদের সৃষ্টি হচ্ছে যা কখনোই স্বেচ্ছাসেবীদের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পড়ে না। অথচ আমরা দিব্যি নিজেদের স্বেচ্ছাসেবক দাবী করে আসছি। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবকের গুণাবলি নিজেদের মধ্যে অর্জন করার চেষ্টাটুকু করছি না।

যাই হোক তবুও অন্তত স্বেচ্ছাসেবী কাজের মাধ্যমে বেশ কিছু মানুষ উপকৃত হচ্ছে। আমার প্রত্যাশা এ ধরণের কাজ আরো এগিয়ে যাবে। তবে তার মধ্যে অবশ্যই নিজেদের স্কিলফুল ও স্বেচ্ছাসেবীর গুণাবলি অর্জনের জন্যও কাজ করতে হবে। তবেই দেশের জন্য আরো বড় পরিসরে কিছু করা সম্ভব হবে।

উদ্যোক্তা হিসেবে আমার কিছু স্বপ্ন বাস্তবায়নের গল্প :

আমি নিজেকে অনেক সফল ও স্বার্থক মানুষ মনে করি কারণ আমি এ পর্যন্ত যতগুলো ভাল কাজের উদ্যোগ নিয়েছি, আল্লাহর রহমতে তার বেশিরভাগেরই স্বপ্নপূরণ হয়েছে বা হচ্ছে।

২০১৩ সালের ফেইসবুক পেইজগুলো থেকেই আমার সফলতার গোড়াপত্তন শুরু হয়। এরপর ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠানের নামে একটি ব্লগ ওয়েবসাইট ডেভেলপ করি যা এখন বহু মানুষের জন্য তথ্য সংগ্রহের একটি বড় মাধ্যম হিসেবে পরিণত হয়েছে। Google এর সার্চ ইঞ্জিন এ IHT /আই এইচ টি লিখে সার্চ দিলেই আমার ডেভেলপ করা ওয়েবসাইট সবার আগে তথ্য প্রদর্শন করে যা সত্যিই আমার জন্য একটি গর্বের বিষয়। দেশের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট কমিউনিটিতে একটি বড় আস্থা ও ভালবাসার জায়গা পেয়েছি আমি তাদের মনে। বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্নজন আমার সাথে যোগাগযোগ করে বিভিন্ন তথ্য জানাতে চায়, আমি আমার সাধ্যমতো তথ্য দেয়ার চেষ্টা করি। এতগুলো মানুষের বিশ্বাস ও ভালবাসা আমার জীবনের অনেক বড় পাওয়া।

২০১৫ সালের দিকে একা একা ব্লাড ম্যানেজমেন্ট এর কাজ না করে একটি শক্তিশালী ও দক্ষ ভলান্টিয়ার টিম তৈরির উদ্যোগ নেই। যারই ফলশ্রুতিতে বর্তমানে “অর্পণ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ” নামে একটি সুপরিচিত ও প্রতিষ্ঠিত সংগঠনের রূপ নিয়েছে। যে প্ল্যার্টফর্ম বর্তমানে ঢাকাস্থ অনলাইন ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যাতম সেরা সংগঠন এর খ্যাতি লাভ করেছে যা সত্যিই অনেক বড় পাওয়া। অর্পণ ফাউন্ডেশন এর স্বেচ্ছাসেবী কাজের মধ্যে নিয়মিত অনলাইন/অললাইনে রক্তদাতার সন্ধান দেয়া, স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচী পরিচালনা, অনলাইনে বিভিন্ন সচেতনতামূলক তথ্য প্রদান, অসহায়দের নিয়ে কাজ করা সহ বেশ কিছু কার্যক্রম পরিচালনা হচ্ছে। বর্তমানে সংগঠনের বয়স ২বছর পার হয়েছে এই অল্প সময়ে আমরা যথেষ্ট সেবামূলক কাজ বাস্তবায়ন করতে সামর্থ হয়েছি। এছাড়া আমরা সংগঠনের উদ্যোগে দুটি আধুনিক ওয়েবসাইটও (www.arpanbd.org , www.bloodbd24.com) তৈরি করতে পেরেছি যার মাধ্যমে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন তথ্যভিত্তিক সেবা পাচ্ছে।

২০১৬ সালের মার্চের দিকে আমি অনলাইন ভিত্তিক আরেকটি স্বপ্ন বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিই। Medinewsbd24.com নামে দেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ভিত্তিক একটি নিউজ পোর্টাল প্রতিষ্ঠা করি যা বর্তমানে দেশের স্বাস্থ্য ভিত্তিক অনলাইন পত্রিকাগুলোর মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় অনলাইন গণমাধ্যম। মেডিনিউজে একই সাথে চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলাজিষ্ট, ডেন্টিষ্ট, ডেন্টাল টেকনোলজিষ্ট, ফার্মাসিষ্ট, ফিজিওথেরাপিষ্ট, হেলথ এসিসট্যান্ট, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা পেশাজিবী সহ সকল চিকিৎসা পেশাজিবীদের সংবাদ সত্যনিষ্ঠ ও নির্ভুলভাবে প্রচার করা হয় যা দেশের আর কোন গণমাধ্যমে করা হয় না। এছাড়া দেশ বিদেশের চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য বিষয়ক সকল খবরাখবর নিয়মিত একঝাঁক তরুন চিকিৎসা পেশাজিবী সাংবাদিকদের দ্বারা প্রকাশিত হয়ে আসছে। ইনশাআল্লাহ ভবিষ্যতে এটি আরো জনপ্রিয়তা ও আস্থা অর্জন করবে।

দেখতে দেখতে বেশ কয়েক বছর পার হয়ে গেল। চলে আসছে আরো একটি নতুন বছর। বিগত বছরগুলোর সফলতা ও বিভিন্ন দক্ষতার অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুনভাবে ২০১৮ সালে মাঠে নামবো আরো কিছু স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে।

আমার উদ্দেশ্য মহৎ ও নিরলস পরিশ্রম থাকলে ইনশাআল্লাহ শ্রষ্ঠা আমার সাহায় হবেন। অনেকগুলো মানুষের দোয়া ও ভালবাসা আমার সাথে আছে। আর সেটাই আমার জীবনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য নিজের সর্বস্ব দিয়ে হলেও মরার আগে পৃথিবীকে কিছু দিয়ে যাওয়ার জন্য কাজ করে যাবো। লক্ষ কোটি শুক্রাণুর সাথে যুদ্ধ করে পৃথিবীতে এসেছি বিজয়ী হয়ে। আর পৃথিবী থেকেও বিদায় নিতে চাই বিজয়ীর বেশে। জন্ম যখন নিয়েছি পৃথিবীতে জন্মের দাগ রেখে যাবো ইনশাআল্লাহ!!

ধন্যবাদান্তে :
ইমন চৌধুরী (ফিজিওথেরাপিষ্ট)
সম্পাদক – মেডিনিউজবিডি২৪.কম
সভাপতি – অর্পণ ফাউন্ডেশন, বাংলদেশ
যুগ্ম আহ্বায়ক – জাতীয় যুব সংসদ, বাংলাদেশ

অনলাইন মিডিয়া ও স্বেচ্ছাসেবী কাজের কিছু স্মৃতিময় সুখ দুঃখের অভিজ্ঞতা

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *