ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা সহ পুরো পরিবারই স্বেচ্ছায় রক্তদাতা

রক্তদান একটি মহৎ ও অসাধারণ সেবামূলক কাজ। মানবতার একটি শ্রেষ্ঠদান স্বেচ্ছায় রক্তদান। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ৯.৫ লক্ষ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। কিন্তু প্রয়োজনের প্রায় ৫০% রক্ত পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু এখনো অনেক ঘাটতি রয়ে গেছে। যার ফলে এখনো দেশে বহু মানুষ জরুরী মুহুর্তে রক্তের অভাবে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। তাই দেশের রক্তের এ বিশাল সমস্যা দূর করতে সারাদেশে কাজ করে যাচ্ছে বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতা সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবকগণ।

আজ এমনই মানবতার একজন সেবকের গল্প বলবো, যিনি মানব সেবায় নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন স্বেচ্ছায় রক্তদানে সবাইকে উদ্বুদ্ধ করে দেশের রক্তের সমস্যা নিরসন করার জন্য।

নাম তার সাখাওয়াত হোসেন চৌধুরী, দেশব্যাপী “ইমন চৌধুরী” নামে সুপরিচিত। তিনি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অর্পণ ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ এর প্রতিষ্ঠাতা ও সভাপতি। ২০১৫ সালে অর্পণ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের মানুষকে সেবাদানের লক্ষ্যে। নিজে স্বেচ্ছায় রক্তদানের পাশাপাশি স্বেচ্ছায় রক্তদানে উদ্বুদ্ধকরণ, বিনামূল্যে স্বেচ্ছায় রক্তদাতা ম্যানেজ করে দেয়া, অসহায়দের পাশে দাঁড়ানো সহ বেশ কিছু স্বেচ্ছাসেবী কাজ করে যাচ্ছেন নিয়মিত। তিনি একজন নিয়মিত A-ve রক্তদাতা। এ পর্যন্ত ২২বার স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন।

সবচেয়ে বড় কথা তিনি একটি গর্বিত রক্তদাতা পরিবারের একজন সদস্য। তার পরিবারের রক্তদানের উপযুক্ত সকলেই স্বেচ্ছায় রক্তদান করেন। মজার বিষয় উনার বাবা জনাব “ফরহাদ হোসেন চৌধুরী” একজন A+ve স্বেচ্ছায় রক্তদাতা। এবং উনার মা “মর্জিনা খাতুন” একজন B+ve রক্তদাতা।

ইমনের বাবা জীবনে ৩ বার রক্তদান করেন, এবং তিনি প্রতিবারই তাঁর বাবাকে হাসপাতালে নিয়ে রক্তদান করান। এছাড়া ইমনে মা একবার জাতীয় ক্যন্সার হাসপাতালে একজন ক্যন্সার হাসপাতালে একজন মুমুর্ষ রোগিকে রক্তদান করেন।

ইমনের ছোট বোন “জান্নাতুল ফেরদৌস ইতু” এস এস সি পাশ করে এখন ডিপ্লোমা ইন ফিজিওথেরাপিতে অধ্যয়ন করছে। ইতুর রক্তের গ্রুপ B+ve। তার বয়স ১৮ হবার পর একদিন ইমন তাকে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে গিয়ে একজন লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত বাবাকে রক্তদান করায়। ইমনের আরো দুজন ছোট বোন আছে যাদের বয়স এখনো ১৮ হয়নি। তাদের বয়স ১৮ হলেই তারাও রক্তদান করবে।

দেশের স্বেচ্ছাসেবীদের মাঝে ইমন চৌধুরীর পরিবার একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। সচরাচর এমন পরিবার দেখা যায় না যেখানে বাবা-মা, ভাই-বোন সবাই রক্তদাতা।

এমন পরিবারের সদস্য হিসেবে অনুভূতির কথা ইমন চৌধুরীর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, একটি স্বেচ্ছায় রক্তদাতা পরিবারের সদস্যা হতে পেরে নিজেকে আমি ধন্য মনে করি। আল্লাহ আমার সহায় ছিলেন, যার ফলেই এটা সম্ভব হয়েছে। আমার বাবা-মা দুজনকেই আল্লাহতাআলা সুস্থ রেখেছিলেন বিধায়ই আমি তাদের সচেতন করিয়ে রক্তদান করাতে পেরেছি।

বাবা-মা ও বোনকে রক্তদান করানোর স্মৃতির কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, একদিন আমার কাছে মিডফোর্ড হাসপাতালে A+ve রক্তের প্রয়োজনে একটা জরুরী ফোন আসে। সেদিন আমার পাশে ক্লাশ নাইনে পড়ুয়া আমার ছোট বোন নিতু ব্যপারটা শুনে আমাকে বলে, আব্বুর তো এ পজেটিভ। আব্বুকেই নিয়ে যা। তখন আমি দুষ্টুমি করে আব্বুকে বলি, আব্বু দিবেন নাকি রক্ত? আব্বু তখনই বলেন, চল গিয়ে দিয়ে আসি। আমি তো বাংলাবাজারে একটা কাজে যাচ্ছি, যাওয়ার পথে দিয়ে আসা যাবে। শুনেই আমি অনেকটা অবাক হই। এরপর দুপুরে খাওয়া দাওয়া করেই বাবাকে নিয়ে বাড্ডা থেকে মিডফোর্ড হাসপাতালের দিকে রওনা হই। আমার বাবার বর্তমান বয়স ৫০ বছর। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকলে ৫৫ বছর পর্যন্তও রক্তদান করা যায়। তাই বাবার রক্তদানে আর কোন বাধা ছিল না। সেদিন রক্তদান করে বাবা আবার অফিসে চলে গেলেন, আর আমি বাসায় ফিরলাম।

মায়ের রক্তদানের ঘটনাটাও খুব মজার, একদিন মহাখালীর ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে B+ve রক্তের রিকুয়েষ্ট আসলে। আমি আম্মুকে দুষ্টুমি করে বললাম, আম্মু তুমি তো অনেক মোটা হয়ে গেছ, রক্তদান করলে শরীরে হৃদরোগ এর ঝুকি কমে যাবে। চলো রক্ত দিয়ে আসি। আম্মু বললো রক্ত দিলে আমাকে কি দিবে? আমি বললাম তোমার সব রকম চেকাপ ফ্রি হয়ে যাবে। তখন আম্মু বললো চল দেখি। বলা মাত্রই আম্মুকে নিয়ে ক্যান্সার হাসপাতালে গেলাম। সেখানকার মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট রবিউল ভাই আমার সুপরিচিত। তিনি দেখে খুবই অবাক হলেন, যেখানে যুবক-যুবতীরা রক্তদান করতে ভয় পায় আর সেখানে আমি আমার মা’কে নিয়ে চলে এসেছি রক্তদান করাতে। সেদিন রক্ত দিয়ে আম্মুকে বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে আমি অফিসে গেলাম।

বোনের রক্তদানের কথা বলতে গেলে, আমার বোন বছর খানিক আগে এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে এখন ফিজিওথেরাপিতে ডিপ্লোমা করছে। ওকে আমি প্রায়ই বলতাম, তোর বয়স ১৮ হলে রক্ত দিতে হবে কিন্তু। সে বলতো হ্যা অবশ্যই আমি রক্ত দিবো। একদিন ঢাকা মেডিকেল থেকে B+ve এর রিকুয়েস্ট আসার পর বোনকে নিয়ে গিয়ে রক্তদান করালাম। পরিবারের সবাইকে স্বেচ্ছায় রক্তদান করাতে পেরে আমি নিজেকে খুবই গর্বিত স্বেচ্ছাসেবক মনে করি। কারণ, এমন দৃষ্টান্ত খুব কমই আছে। এজন্য আমি খুবই ভাগ্যবান।

সর্বোপরি মানব সেবাই ইমন চৌধুরীর পরিবার একটি অনুকরণীয় পরিবার। দেশের ঘরে ঘরে এ রকম আরো রক্তদাতা তৈরি হোক। মানবতা এগিয়ে যাক।

ছেলে-মেয়ে, বাবা-মা সহ পুরো পরিবারই স্বেচ্ছায় রক্তদাতা

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *