বিয়ে করবেন? সবার আগে জেনে নিন হবু বর-কনের রক্তের গ্রুপ!

বিয়ে নিয়ে তরুন-তরুনীদের মনে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিয়ের আগে দুই পরিবারের বংশ পরিচয়, আত্নীয় স্বজন, টাকা-পয়সা বা রুপ সৌন্দর্য এবং এই সম্পকৃত যাবতীয় তথ্যাবলী জানার আপ্রান চেষ্টা থাকে দুই পরিবারের মধ্যেই। কিন্তু বিয়ের আগে এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ন একটি বিষয় হচ্ছে পাত্র-পাত্রী উভয়ের রক্তের গ্রুপ জেনে নেয়া, কিন্তু রক্তের গ্রুপ জানতে আমরা মোটেও আগ্রহ হই না। আমাদের সমাজে আরেকটি ধারনা প্রচলিত আছে যে বর-কনের রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে মৃত সন্তান জন্ম হতে পারে বা নানা রকম সমস্যা হতে পারে। কিন্তু আসলেই কি তাই? আসুন জেনে নেই এ সম্পর্কে বিস্তারিত।

প্রথমে জেনে নেওয়া যাক রক্তের গ্রুপ বা ব্লাড গ্রুপ কি?

আমাদের শরীরের রক্তের গ্রুপ নির্নীত হয়ে থাকে দুটি প্রক্রিয়ার। প্রথমটিকে বলা হয় ‘ABO System’ যা মূলত রক্তের গ্রুপ যেমন A, B, AB, ও O। আর দ্বিতীয়টি হলো ‘RH Factor’ বা রেসাস ফ্যাক্টর। এখানে দুটি ভাগ রয়েছে ‘RH+’ বা ‘আর এইচ পজেটিভ’ এবং ‘RH-‘ বা ‘আর এইচ নেগেটিভ’। রক্তের ‘ABO System’ এর সাথে ‘RH Factor’ যুক্ত হয়ে তবেই নির্নীত হয় রক্তের গ্রুপ। অর্থাৎ রক্তের ‘ABO System’ এর সাথে ‘RH Factor’ যুক্ত হয়ে নির্ধারিত হয় রক্তের গ্রুপ কি এবং তা নেগেটিভ নাকি পজেটিভ।

যদি এক গ্রুপের রক্ত অন্য গ্রুপে দেওয়া হয় তবে কি ঘটবে???

যদি এক গ্রুপের রক্ত অন্য গ্রুপে দেওয়া হয় তবে প্রাথমিক ভাবে কিছুই ঘটবে না। তবে সে ব্যক্তিটির শরীরে একটি ‘RH Antibody’ তৈরি হবে। যার ফলে ঐ ব্যক্তিটি যদি ভবিশ্যতে আবার বিপরীত ধরনের রক্ত গ্রহন করে তবে তার ফলাফল হবে ভয়াবহ্, ব্যক্তিটির ব্লাড সেল বা রক্ত কনিকা ভেঙ্গে যাবে ফলে ব্যক্তিটির আকস্মিত মৃত্যু হতে পারে। একে বলা হয় “ABO Incompatibility”. তাই কারো রক্ত যদি পজেটিভ হয় তাহলে তাকে ঐ গ্রুপের পজেটিভ রক্তই দেয়া হয় আর নেগেটিভ হলে ঐ গ্রুপের নেগেটিভ রক্তেই দেয়া হয়। সাধারন ভাবে “O” গ্রুপের রক্তকে বলা হয় ‘সর্বজনীন দাতা’ অর্থাৎ এই রক্ত সকল গ্রুপকে দেওয়া যেতে পারে তবে তা অবশ্যই পজেটিভ ও নেগেটিভ মিলতে হবে, অর্থাৎ “O+ve” রক্ত সকল পজেটিভ গ্রুপকে দেয়া যেতে পারে এবং “O-ve” কে সকল নেগেটিভ গ্রুপকে দেওয়া যেতে পারে। আর “AB” গ্রুপের রক্তকে বলা হয় সর্বজনীন গ্রহীতা, এখনেও একই ভাবে অবশ্যই পজেটিভ ও নেগেটিভ মিলতে হবে, অর্থাৎ “AB+ve” ধারীকে সকল পজেটিভ গ্রুপ থেকে রক্ত দেওয়া যেতে পরে এবং “AB-ve” ধারীকে সকল নেগেটিভ গ্রুপ থেকে রক্ত দেওয়া যেতে পারে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে আমাদের দেশে এক গ্রুপের রক্ত অন্য গ্রুপে দেওয়ার ব্যবস্থা চালু নেই। এর কারন হচ্ছে রক্তের অনেক ধরনের টাইপ আছে যেমন ডাফি, লুইস ইত্যাদি, এইগুলোর স্ক্রিনিং টেস্টের উপাদান (রিজেন্ট) আমাদের দেশে সহজলভ্য না এবং একই গ্রুপ থেকে রক্ত গ্রহন বেশি নিরাপদ। আমাদের দেশে শুধুমাত্র পিজি হাসপাতালে এই স্ক্রিনিং করার ব্যবস্থা আছে কিন্তু এর ব্যবহরিক প্রয়োগ নেই।

তাহলে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ কেমন হওয়া উচিত???

বিশেষজ্ঞদের মতে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে কোন সমস্যা নেই। তবে স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজেটিভ হলে স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ অবশ্যই পজেটিভ হতে হবে কোন ভাবেই নেগেটিভ হওয়া যাবে না, অর্থাৎ নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ ধারী নারীরা কেবল নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ ধারী পুরুষকেই বিয়ে করা নিরাপদ। আর স্বামীর রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ হলে স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ পজেটিভ বা নেগেটিভ একটি হলেই চলবে।

যদি তা না হয় তাহলে কি সমস্য হতে পারে???

বিশেজ্ঞদের মতে স্বামী-স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ মিলে গেলে কোন সমস্যা নেই, তবে ভিন্ন ব্লাড গ্রুপের হ্মেত্রে স্ত্রীর যদি নেগেটিভ হয় আর স্বমীর যদি পজেটিভ হয় তবে সন্তান জন্মের সময় ‘লিথাল জিন’ বা ’মরন জিন’ নামে একটি জিন তৈরি হয় যা পরবর্তিতে জাইগোট তৈরিতে বাঁধা সৃষ্টি করে। বা জাইগোট মেরে ফেলে, সেহ্মেত্রে মৃত সন্তান জন্ম হয়ে থাকে।

আর স্বামীর রক্তের গ্রুপ পজেটিভ হলে সাধারনত বাচ্চার রক্তের গ্রুপও পজেটিভ হয়, কিন্তু যখন কোন নেগেটিভ ব্লাড গ্রপের মা ‘Positive Fetus’ বা ’পজেটিভ ভ্রুন’ ধারন করবে তখন সাধারনত প্রথম বাচ্চার হ্মেত্রে কোন সমস্যা হয় না। কিন্তু ডেলিভারির সময় ‘Positive Fetus’ বা ’পজেটিভ ভ্রুন’ এর ব্লাড, “Placental Barrier” বা ”গর্ভফুলের বাধা” বেধ করে “Placental Displacement” এর সময় মায়ের শরীরে প্রবেশ করবে, যা ডেলিভারি হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মায়ের শরীরে ‘RH Antibody’ তৈরি করবে যা সম্পর্কে আমরা প্রথমেই জেনেছি, তাই বিশেজ্ঞদের মতে এহ্মেত্রে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের সময় সমস্যা হবে। ঐ মা যখন দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে ধারন করবে তখন যদি গর্ভের Fetus বা ভ্রুনের ব্লাড গ্রুপ পুনরায় পজেটিভ হয় তাহলে মায়ের শরীরে পূর্বের সন্তান জন্মদেয়ার সময় যে ‘RH Antibody’ তৈরি হয়েছিলো সেটি ”Placental Barrier” বা ”গর্ভফুলের বাধা” বেধ করে বাচ্চার শরীরে প্রবেশ করবে। আর যখন Fetus বা ভ্রুনের এর শরীরে ‘RH Antibody’ ঢুকবে তখন ‘Fetal” বা ভ্রুনের ‘RBC’ এর সঙ্গে ‘Agglutination’ বা জমাট বাধা রক্ত তৈরি হবে, যেকারনে ‘RBC’ ভেঙ্গে যাবে এবং অতিরিক্ত রক্ত হ্মরন হবে। এটিকে মেডিকেল টার্মে ‘RH Incompatibility’ বলা হয়ে থাকে, যার ফলে শিশুটি মারা যাবে।

তাই পজেটিভ ব্লাড গ্রুপের পুরুষ নেগেটিভ গ্রুপের মহিলাকে বিয়ে করলে তাদের একটিই জীবিত সন্তান থাকার সম্ভবনা বেশি। আর কোন কারনে প্রথম সন্তানটি জন্ম না নিলে পরবর্তীতে তাদের নিঃসন্তান থেকে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

আশার ব্যাপার

এখন আর মহিলাদের নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ খুব বেশি সমস্যা করেনা, যদি আগে কখনো অ্যাবরশন না হয়ে থাকে। শুধু সচেতন থাকতে হবে। স্বামীর ব্লাডগ্রুপ পজিটিভ হলে, বাচ্চার জন্মের পরপরই বাচ্চার ব্লাডগ্রুপ পরীক্ষা করতে হবে। যদি নেগেটিভ হয় মায়ের মত, তবে কিছু করার দরকার নাই। আর পজিটিভ হলে ”এন্টি ডি ইনজেকশন” নিতে হবে ডেলিভারির ৭২ ঘণ্টার মধ্যে।

যদি আগে কখনো অ্যাবরশন হয়ে থাকে এবং তখন ”এন্টি ডি ইনজেকশন” না নেয়া হয় তবে সমস্যা হতে পারে যদি সেই বাচ্চার পিতা পজিটিভ রক্তগ্রুপের হয়। সুতরাং আগে অ্যাবরশন হওয়ার পর ইনজেকশন না নিলে নেগেটিভ রক্তের গ্রুপের কোন পুরুষকে বিয়ে করা শ্রেয়।

তাই বিয়ের আগেই সচেতন হোন, ধন-সম্পদ বা রুপ-সৌন্দর্য নয় সবার আগে জেনে নিন নিজের ও হবু স্ত্রীর রক্তের গ্রুপ। স্বামী-স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে গড়ে তুলুন একটি সুখী পরিবার।

নিজে সচেতন হোন এবং শেয়ার করে অন্যদের জানিয়ে দেন।

 

বিয়ে করবেন? সবার আগে জেনে নিন হবু বর-কনের রক্তের গ্রুপ!

You May Also Like

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *